← মূল পেজে ফিরে যান

পৃথিবীর প্রথম শহর কীভাবে জন্ম নিয়েছিল মেসোপটেমিয়ায়

রিপোর্টার: জুনায়েদ আল হাবীব | প্রকাশিত: 09 Sep 2026, 08:45 AM | ক্যাটাগরি: অন্যান্য
News Image
ভাবুন তো, আজকের পৃথিবীর শহর, আইন, লিখিত ইতিহাস কিংবা প্রশাসন—এসবের শুরুটা যদি খুঁজতে হয় হাজার হাজার বছর পেছনে, তাহলে কোথায় যেতে হবে? উত্তর হলো—টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝের এক প্রাচীন ভূখণ্ড, মেসোপটেমিয়া। প্রায় ১২ হাজার বছর আগে পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরফযুগ শেষের দিকে, মানুষ ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়াত। স্থায়ী বাড়ি বা শহর ছিল না। খাবারের জন্য কখনো শিকার, কখনো বুনো ফলমূল ও উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল—প্রকৃতির ওপর শুধু নির্ভর না করে খাবার নিজেও উৎপাদন করা সম্ভব। এই পরিবর্তনের পেছনে নদীগুলোর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের তীরবর্তী জমিতে বন্যার পর জমে থাকত উর্বর পলি। সেখানে গম, যবসহ বিভিন্ন ফসল ফলানো তুলনামূলক সহজ ছিল। মানুষ নদীর আশেপাশে স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে শুরু করল। কৃষির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বাড়ল, তৈরি হলো অতিরিক্ত খাদ্য মজুত। আর এই অতিরিক্ত খাদ্যই মানবসমাজকে বদলে দিল। সবাইকে আর কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকতে হলো না। কেউ মাটির পাত্র বানাতে শুরু করল, কেউ কাপড় বুনল, কেউ ধাতুর কাজ করল, আবার কেউ বাণিজ্য ও প্রশাসনের দায়িত্ব নিল। গ্রামের পর গ্রাম বড় হতে হতে একসময় গড়ে উঠল বিশাল নগরকেন্দ্র। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল উরুক। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে উরুক ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সংগঠিত নগর। এখানে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করত। ছিল বিশাল স্থাপনা, বাজার, কারিগরের কর্মশালা এবং ধর্মীয় কেন্দ্র। কিন্তু এত বড় একটি শহর পরিচালনা করতে গিয়ে একটি নতুন সমস্যা দেখা দিল—হাজার হাজার মানুষের শস্য, কর, পশু, পণ্য ও শ্রমের হিসাব কীভাবে রাখা হবে? মানুষের স্মৃতির ওপর আর নির্ভর করা সম্ভব ছিল না। এখান থেকেই জন্ম নিল লেখার প্রয়োজনীয়তা। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালের দিকে সুমেরীয়রা কাদার ফলকের ওপর খোঁচা দিয়ে বিশেষ চিহ্ন তৈরি করতে শুরু করে। এই লিখনপদ্ধতিকে আমরা আজ কিউনিফর্ম বা কীলকাকার লিপি নামে চিনি। শুরুতে এগুলো সাহিত্য লেখার জন্য নয়, বরং শস্য, পশু, পণ্য ও বাণিজ্যের হিসাব রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এই ছোট্ট আবিষ্কারই মানুষের জ্ঞানকে স্মৃতির সীমা থেকে বের করে লিখিত ইতিহাসের যুগে নিয়ে গেল। শুধু লেখাই নয়, মেসোপটেমিয়ায় চাকার ব্যবহারও মানুষের জীবনকে পাল্টে দেয়। প্রথমদিকে এটি সম্ভবত মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত হলেও পরে গাড়িতে যুক্ত হয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যকে অনেক সহজ করে তোলে। এরপর সমাজ আরও জটিল হয়ে উঠল। ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রশাসন, বাণিজ্য এবং ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলো। বিশাল মন্দির ও জিগুরাত নির্মিত হতে লাগল। শহরগুলোকে পরিচালনা করার জন্য শাসক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলো। আর একসময় আইন ও নিয়মকানুনও লিখিত রূপ পেতে শুরু করল। তাই মেসোপটেমিয়াকে শুধু একটি প্রাচীন ভূখণ্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানকার নদী, কৃষি, নগর, বাণিজ্য, লিখনপদ্ধতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমন্বয় মানবসভ্যতার গতিপথই বদলে দিয়েছিল। হয়তো তখনকার মানুষ জানত না তারা ইতিহাস তৈরি করছে। কিন্তু তাদের তৈরি সেই শহর, মাটির ফলক আর নদীর তীরে গড়ে ওঠা সমাজই পরবর্তী সভ্যতাগুলোর জন্য রেখে গিয়েছিল এক বিশাল উত্তরাধিকার—যার প্রভাব আজকের পৃথিবীতেও আমরা দেখতে পাই।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন