← মূল পেজে ফিরে যান
পেত্রা নগরী কেন এত বিখ্যাত?
রিপোর্টার: সালমা জাহান |
প্রকাশিত: 07 Oct 2026, 11:54 AM |
ক্যাটাগরি: অন্যান্য
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, মরুভূমির এক দুর্গম এলাকায় এমন একটি শহর গড়ে উঠেছে, যার বিশাল স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গা কেটে তৈরি করা! কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে এমন নগরী তৈরি করেছিল—এই প্রশ্নই পেত্রাকে আজও বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পরিণত করেছে। জর্ডানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরের নাম পেত্রা।
পেত্রার ইতিহাস মূলত নাবাতীয় সভ্যতার সঙ্গে জড়িত। খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী আগে আরব অঞ্চলের নাবাতীয়রা এই দুর্গম এলাকাকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বসতি ও রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে। পাহাড়ে ঘেরা হওয়ায় শহরটি ছিল প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা সুরক্ষিত। একই সঙ্গে এর ভৌগোলিক অবস্থান বাণিজ্যের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীনকালে আরব উপদ্বীপ, লেভান্ট ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত করা বণিকদের গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছাকাছি ছিল পেত্রা। ধূপ, মশলা, সুগন্ধি দ্রব্য, কাপড়সহ নানা মূল্যবান পণ্য এই অঞ্চল দিয়ে পরিবহন করা হতো। এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে নাবাতীয়রা বিপুল সম্পদ অর্জন করে। সেই সম্পদের ব্যবহারেই পেত্রায় গড়ে ওঠে অসাধারণ সব পাথুরে স্থাপনা।
তবে পেত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল শুধু বাণিজ্যে নয়, পানি ব্যবস্থাপনায়। চারপাশের অঞ্চল ছিল শুষ্ক এবং পানির উৎস ছিল সীমিত। তাই নাবাতীয়রা বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য জলাধার, বাঁধ, নালা এবং ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করে। পাহাড়ি ঢল নিয়ন্ত্রণ করে পানিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার এই প্রযুক্তি তাদের নগরজীবনকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পেত্রার স্থাপত্যেও নাবাতীয়দের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাহাড়ের পাথর সরাসরি কেটে তৈরি করা হয়েছিল সমাধি, মন্দির এবং বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ। এর মধ্যে ‘আল-খাজনেহ’ বা ট্রেজারি সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর একটি। পাশাপাশি শহরে ছিল রাস্তা, বাজার, থিয়েটার এবং অন্যান্য স্থাপনা।
খ্রিস্টীয় ১০৬ সালে নাবাতীয় রাজ্য রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। রোমান শাসনেও পেত্রার গুরুত্ব কিছু সময় বজায় ছিল। এ সময় শহরের স্থাপত্যে রোমান প্রভাব যুক্ত হয় এবং পেত্রা আরও বড় নগরকেন্দ্রে পরিণত হয়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে পেত্রার পতন শুরু হয়। বাণিজ্যিক পথের পরিবর্তন এবং সমুদ্রপথের গুরুত্ব বাড়ার কারণে স্থলবাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়। এর সঙ্গে ভূমিকম্পে বিভিন্ন স্থাপনা ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে জনবসতি কমতে থাকে এবং একসময় পেত্রা প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী বাইরের বিশ্বের কাছে পেত্রা অনেকটাই অজানা ছিল। স্থানীয় বেদুইনরা এর অবস্থান জানলেও ১৮১২ সালে সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডভিগ বার্কহার্ড পেত্রায় পৌঁছে এই প্রাচীন নগরীর কথা ইউরোপীয় বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে পেত্রার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। আর ২০০৭ সালে বিশ্বের নতুন সাত আশ্চর্যের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয় পেত্রা।
আজ পেত্রা শুধু একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ নয়। এটি নাবাতীয়দের বাণিজ্যিক দক্ষতা, স্থাপত্যজ্ঞান এবং মরুভূমির মতো কঠিন পরিবেশে পানি ব্যবস্থাপনার অসাধারণ সক্ষমতার এক জীবন্ত প্রমাণ।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: