← মূল পেজে ফিরে যান
বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি কে?
রিপোর্টার: জুনায়েদ আল হাবীব |
প্রকাশিত: 16 Oct 2026, 08:27 PM |
ক্যাটাগরি: ভাইরাল ও ট্রেন্ডিং
ছবি ক্রেডিট: ফাইল ফুটেজ
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম লেখা রয়েছে, যাদের পরিচয় গড়ে উঠেছে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে। কেউ ক্ষমতার লোভে নিজের দেশের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, কেউ অর্থের বিনিময়ে বিসর্জন দিয়েছেন দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, আবার কেউ নিজের স্বার্থের জন্য বদলে দিয়েছেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে।
ধর্মীয় ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি যিহূদা ইস্কারিয়ত। খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন যিশু খ্রিস্টের বারোজন ঘনিষ্ঠ শিষ্যের একজন। অথচ সেই ঘনিষ্ঠতার পরও তিনি অর্থের বিনিময়ে যিশুকে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। প্রচলিত বর্ণনায়, এই অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০টি রৌপ্য মুদ্রা। যিশুকে শনাক্ত করে দেওয়ার এই ঘটনা তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতার এক বিশ্বজনীন প্রতীকে পরিণত করেছে। আজও অনেক ভাষায় ‘জুডাস’ নামটি বিশ্বাসঘাতক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
তবে উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি সামনে আসে, তিনি মীর জাফর। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে থাকা মীর জাফর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন সমঝোতায় জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধের সময় তাঁর বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নবাবের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর মীর জাফর বাংলার নবাব হলেও প্রকৃত ক্ষমতা ক্রমে চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। এই ঘটনা বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার জনস্মৃতিতে মীর জাফরের নাম আজও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বেনেডিক্ট আর্নল্ড এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর নাম বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন কন্টিনেন্টাল আর্মির একজন দক্ষ জেনারেল। যুদ্ধক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি একসময় প্রশংসাও পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দুর্গ ও তথ্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর এই অবস্থান পরিবর্তন আমেরিকানদের কাছে গভীর বিশ্বাসভঙ্গের উদাহরণ হয়ে আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের নেতা ভিদকুন কুইসলিংও ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানি নরওয়ে দখল করার পর তিনি জার্মানদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসেন এবং দখলদারদের স্বার্থে কাজ করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘কুইসলিং’ শব্দটি বিভিন্ন ভাষায় শত্রুর সহযোগী বা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলকে ঘিরে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নাম গভীর বিতর্ক ও নিন্দার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ওই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের জনপরিসরে তাঁর ভূমিকা বিশ্বাসঘাতকতার আলোচনায় বারবার ফিরে আসে।
তাহলে, এদের মধ্যে কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক? এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত উত্তর নেই। কারণ বিশ্বাসঘাতকতার মূল্যায়ন নির্ভর করে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট, মানুষের বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ঘটনার পরিণতির ওপর। যিহূদা ইস্কারিয়ত ধর্মীয় ইতিহাসে, মীর জাফর উপমহাদেশে, বেনেডিক্ট আর্নল্ড যুক্তরাষ্ট্রে এবং কুইসলিং ইউরোপে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছেন।
ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ কিংবা শত্রুর সঙ্গে গোপন সমঝোতা কখনো কখনো শুধু একজন মানুষকে নয়, বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎও। শেষ পর্যন্ত, বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু হারানো ক্ষমতা বা সম্পদ নয়; মানুষের আস্থা হারানো, যে ক্ষত অনেক সময় শতাব্দী পেরিয়েও মুছে যায় না।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: