← মূল পেজে ফিরে যান
মোনালিসার ছবি কেন বিখ্যাত?
রিপোর্টার: সালমা জাহান |
প্রকাশিত: 11 Oct 2026, 04:05 PM |
ক্যাটাগরি: অন্যান্য
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, একটি ছবির দিকে তাকিয়ে আছে কোটি কোটি মানুষ, অথচ পাঁচশ বছর পেরিয়েও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না, ছবির নারীটি আসলে কীভাবে হাসছেন! শুধু তাই নয়, একসময় এই ছবিটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, যা এর খ্যাতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কী আছে এই ছবিতে, যা একে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর একটিতে পরিণত করেছে? কেন আজও এর হাসি, আঁকার কৌশল আর ইতিহাস নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই? ছবিটির নাম মোনালিসা, আর এর পেছনের গল্প যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই বিস্ময়কর।
মোনালিসা পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত চিত্রকর্মগুলোর একটি। ইতালীয় রেনেসাঁ যুগের প্রতিভাবান শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ষোড়শ শতকের শুরুতে ছবিটি আঁকেন। ধারণা করা হয়, ছবির নারীটি ছিলেন ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের রেশম ব্যবসায়ী ফ্রান্সেসকো দেল জোকোন্দোর স্ত্রী লিসা গেরারদিনি। তাঁর নাম থেকেই ছবিটির নাম হয় মোনালিসা। ইতালীয় ভাষায় ‘মোনা’ শব্দটি নারীদের সম্মান জানিয়ে সম্বোধন করার একটি প্রচলিত রূপ।
তবে মোনালিসাকে বিখ্যাত করার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো তাঁর সেই অদ্ভুত হাসি। কখনো মনে হয় তিনি মৃদু হাসছেন, আবার কখনো মনে হয় তাঁর মুখে কোনো হাসিই নেই। এর পেছনে রয়েছে দা ভিঞ্চির অসাধারণ শিল্পকৌশল। মুখের বিভিন্ন অংশে আলো ও ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহার এমন একটি অভিব্যক্তি তৈরি করেছে, যা দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আলাদা মনে হতে পারে। তাই শত শত বছর ধরে এই হাসি মানুষের কৌতূহল ধরে রেখেছে।
ছবিটিকে এত জীবন্ত দেখানোর আরেকটি কারণ হলো ‘স্ফুমাতো’ নামের বিশেষ কৌশল। এই পদ্ধতিতে রঙের পাতলা স্তর ব্যবহার করে এক রং থেকে অন্য রঙে এমনভাবে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে স্পষ্ট ও কঠিন রেখা চোখে পড়ে না। ফলে মুখের গঠন, ঠোঁটের কোণ এবং চোখের চারপাশের আলোছায়া অনেক বেশি স্বাভাবিক দেখায়। দা ভিঞ্চির এই দক্ষতা মোনালিসাকে সাধারণ প্রতিকৃতির চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
কিন্তু ছবিটির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯১১ সালে। সে বছর প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর থেকে মোনালিসা চুরি হয়ে যায়। ভিনসেঞ্জো পেরুজিয়া নামের এক ইতালীয় ব্যক্তি এই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছবিটি নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। প্রায় দুই বছর পর, ১৯১৩ সালে ইতালিতে ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাই মোনালিসাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।
মোনালিসার যাত্রাপথও বেশ আকর্ষণীয়। দা ভিঞ্চির মৃত্যুর পর ছবিটি ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের সংগ্রহে যায়। পরবর্তী সময়ে এটি ফরাসি রাজকীয় সংগ্রহের অংশ হয়ে ওঠে। বর্তমানে প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে ছবিটি সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ শুধু একবার মোনালিসাকে দেখার জন্য সেখানে আসেন।
ছবিটির পটভূমিতে দেখা যায় পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ এবং দূরের এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্য। শিল্পী কীভাবে এই পরিবেশকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন, তা নিয়েও শিল্পপ্রেমীদের আগ্রহ রয়েছে। মোনালিসার বসার ভঙ্গি, মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি এবং পটভূমির সঙ্গে তাঁর অবয়বের মসৃণ সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এটি রেনেসাঁ যুগের শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন।
সব মিলিয়ে মোনালিসার জনপ্রিয়তা শুধু তাঁর রহস্যময় হাসির জন্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসাধারণ শিল্পদক্ষতা, রাজকীয় ইতিহাস এবং একটি চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনা। পাঁচশ বছর পেরিয়েও ছবিটি মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যতই উত্তর খুঁজি, ততই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। তাহলে মোনালিসার আসল আকর্ষণ কি তাঁর হাসিতে, নাকি সেই হাসিকে ঘিরে মানুষের অফুরন্ত কৌতূহলে?
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: