← মূল পেজে ফিরে যান

প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াই তাইওয়ান কীভাবে এত ধনী হলো

রিপোর্টার: জুনায়েদ আল হাবীব | প্রকাশিত: 09 Sep 2026, 08:43 AM | ক্যাটাগরি: অন্যান্য
News Image
একটা সময় ছিল, যখন আজকের প্রযুক্তিশক্তি তাইওয়ানকে দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে এই ছোট দ্বীপ একদিন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানের অর্থনীতি ছিল দুর্বল, শিল্প ছিল সীমিত এবং দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই সেই তাইওয়ান কীভাবে বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রযুক্তি অর্থনীতিতে পরিণত হলো? এই পরিবর্তনের শুরু বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৯৫ সালে। চীন-জাপান যুদ্ধের পর তাইওয়ান জাপানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং প্রায় পাঁচ দশক জাপানি শাসনের অধীনে থাকে। এই সময় দ্বীপটিতে রেলপথ, বন্দর, সেচব্যবস্থা ও বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি হয়। যদিও এসব উন্নয়নের পেছনে জাপানের নিজস্ব স্বার্থ ছিল, পরবর্তীতে এগুলো তাইওয়ানের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। চীনের গৃহযুদ্ধের পর বিপুলসংখ্যক মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে তাইওয়ানে চলে আসে। ছোট একটি দ্বীপে হঠাৎ এত মানুষের আগমন খাদ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে। তার ওপর ছিল সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এবং অর্থনৈতিক সংকট। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে তাইওয়ান প্রথমে গুরুত্ব দেয় কৃষিকে। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকদের জমির মালিকানা বাড়ানো হয়। নিজের জমি পাওয়ার পর কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আসতে শুরু করে। এরপর শুরু হয় শিল্পায়নের দ্বিতীয় ধাপ। বিদেশ থেকে যেসব সাধারণ পণ্য আমদানি করতে হতো, সেগুলোর অনেকগুলো দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, জুতা, খেলনা ও অন্যান্য হালকা শিল্পের ছোট ছোট কারখানা গড়ে ওঠে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববাজারে পরিচিত হতে শুরু করে ‘Made in Taiwan’ নামটি। তবে তাইওয়ান এখানেই থেমে থাকেনি। সস্তা পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলো এগিয়ে আসার পর তারা বুঝতে পারে, ভবিষ্যৎ দখল করতে হলে প্রযুক্তির দিকে যেতে হবে। তাই সরকার গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় বিপুল গুরুত্ব দেয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Industrial Technology Research Institute বা ITRI। বিদেশি প্রযুক্তি শেখা, গবেষণা করা এবং সেই প্রযুক্তিকে স্থানীয় শিল্পে কাজে লাগানো ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে Hsinchu Science Park, যা ধীরে ধীরে তাইওয়ানের প্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সরকার উন্নত অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে। একই সঙ্গে বহু শিক্ষার্থীকে উন্নত শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। তাদের একটি বড় অংশ পরে দেশে ফিরে এসে নতুন শিল্প গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Taiwan Semiconductor Manufacturing Company বা TSMC। তাদের ব্যবসায়িক মডেল ছিল ভিন্ন—নিজস্ব ব্র্যান্ডের চিপ বিক্রি না করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির ডিজাইন অনুযায়ী চিপ তৈরি করা। ফলে চিপ ডিজাইন করা কোম্পানিগুলোকে নিজেদের বিলিয়ন ডলারের কারখানা তৈরি করতে হয়নি। এই মডেল ধীরে ধীরে পুরো প্রযুক্তি শিল্পকে বদলে দেয়। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক নানা প্রযুক্তির জন্য অত্যাধুনিক চিপ তৈরিতে তাইওয়ানের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে তাইওয়ান আজ বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাইওয়ানের গল্প শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়। শিক্ষা, অবকাঠামো, গবেষণা, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি। এক সময় যে দ্বীপকে ঘিরে ছিল দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের আশঙ্কা, আজ সেই তাইওয়ান বিশ্বের প্রযুক্তি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও তারা দেখিয়ে দিয়েছে—একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ সবসময় মাটির নিচে থাকে না; দক্ষ মানুষ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং সঠিক পরিকল্পনাও একটি দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন