← মূল পেজে ফিরে যান

ইংল্যান্ডের ইতিহাস একটি দ্বীপ কীভাবে জয় করল অর্ধেক পৃথিবী

রিপোর্টার: জুনায়েদ আল হাবীব | প্রকাশিত: 05 Sep 2026, 04:38 PM | ক্যাটাগরি: অন্যান্য
News Image
ভাবুন তো—একটা ছোট দ্বীপ। চারদিকে সমুদ্র। প্রাকৃতিক সম্পদও সীমিত। অথচ একসময় এই দ্বীপের শাসন পৌঁছে গিয়েছিল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কীভাবে? এই গল্প শুরু হয় আজকের ইংল্যান্ডেরও বহু আগে। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে ব্রিটেন আসলে ইউরোপ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না। মাঝখানে ছিল বিশাল এক স্থলভূমি—ডগারল্যান্ড। কিন্তু বরফযুগ শেষ হওয়ার পর সমুদ্রপৃষ্ঠ দ্রুত বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সেই ভূমি ডুবে যায় পানির নিচে। আর ব্রিটেন হয়ে ওঠে একটি দ্বীপ। এরপর হাজার হাজার বছর ধরে এখানে গড়ে ওঠে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতি। তৈরি হয় রহস্যময় স্টোনহেঞ্জের মতো স্থাপনা। কিন্তু এই শান্ত দ্বীপের দিকে খুব শিগগিরই নজর পড়ে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটির। রোম। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ সালে জুলিয়াস সিজার ব্রিটেনে অভিযান চালান। তবে স্থায়ী দখল করতে পারেননি। প্রায় একশ বছর পর, ৪৩ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা আবার ফিরে আসে—এবার অনেক বড় শক্তি নিয়ে। তারা শহর তৈরি করে, রাস্তা বানায়, বাণিজ্য বাড়ায়। লন্ডিনিয়াম—আজকের লন্ডনের—ভিত্তিও তখনই শক্ত হতে শুরু করে। কিন্তু রোমান শাসনও ছিল অপ্রতিরোধ্য নয়। বৌডিকার নেতৃত্বে এক বিদ্রোহ রোমানদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। পরে উত্তরের সীমান্তে তৈরি হয় বিশাল হ্যাড্রিয়ানের প্রাচীর—যেন সাম্রাজ্যের শেষ সীমা। কিন্তু চতুর্থ-পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করলে তারা ব্রিটেন থেকেও সেনা সরিয়ে নেয়। আর তখনই শুরু হয় ক্ষমতার নতুন লড়াই। অ্যাংলো-স্যাক্সনরা এসে বসতি গড়তে থাকে। ছোট ছোট রাজ্য তৈরি হয়। আর যখন মনে হচ্ছিল দ্বীপটি নতুনভাবে স্থির হচ্ছে, তখন সমুদ্রপথে হাজির হলো আরেক ভয়ংকর শক্তি— ভাইকিংরা। ৮ম ও ৯ম শতকে তাদের আক্রমণে ইংল্যান্ডের বড় অংশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সবাই পিছিয়ে যায়নি। ওয়েসেক্সের রাজা আলফ্রেড দ্য গ্রেট ভাইকিংদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ৮৭৮ সালের এডিংটনের যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। একটি বিভক্ত ভূমি ধীরে ধীরে একক রাজ্যের দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু ইতিহাস আবারও মোড় নেয়। ১০৬৬ সাল। নরম্যান্ডির উইলিয়াম ইংল্যান্ডে আক্রমণ করেন। হেস্টিংসের যুদ্ধে ইংরেজ রাজা হ্যারল্ড পরাজিত হন। ইংল্যান্ডের সিংহাসন চলে যায় নরম্যানদের হাতে। এরপর শুধু রাজাই বদলায়নি—বদলে যায় জমির মালিকানা, প্রশাসন, অভিজাত শ্রেণি, এমনকি ইংরেজি ভাষার চরিত্রও। শতাব্দী পেরিয়ে ইংল্যান্ডে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। রাজা কি সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো করতে পারবেন? এই প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকে পার্লামেন্ট। ম্যাগনা কার্টা রাজকীয় ক্ষমতার ওপর সীমারেখা টানার একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে। তারপর আসে টিউডর যুগ। হেনরি অষ্টমের সময় ইংল্যান্ড রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। আর এলিজাবেথ প্রথমের শাসনে ইংল্যান্ডের নৌ-শক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু ক্ষমতার লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। রাজতন্ত্র বনাম পার্লামেন্টের সংঘাত শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে গড়ায়। ১৬৪৯ সালে রাজা চার্লস প্রথমের মৃত্যুদণ্ড বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়—একজন রাজাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। আর ১৬৮৮ সালের Glorious Revolution রাজতন্ত্রের ক্ষমতা আরও সীমিত করে সংসদীয় শাসনের ভিত্তি শক্ত করে। তারপর ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক একীকরণে জন্ম নেয় গ্রেট ব্রিটেন। কিন্তু আসল বিস্ফোরণ তখনও বাকি। শুরু হয় Industrial Revolution। কারখানা, বাষ্পশক্তি, রেলপথ, বাণিজ্য আর সমুদ্রপথ—সব মিলিয়ে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়তে থাকে। একসময় একটি ছোট দ্বীপ এমন এক সাম্রাজ্য তৈরি করে, যার প্রভাব পৃথিবীর বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ইংল্যান্ডের ইতিহাস শুধু রাজা-রানি কিংবা যুদ্ধের গল্প নয়। এটি এমন এক দ্বীপের গল্প—যেখানে ভূগোল বদলেছে, শাসক বদলেছে, ভাষা বদলেছে, সমাজ বদলেছে। আর সেই হাজার বছরের সংঘাত, উদ্ভাবন ও ক্ষমতার লড়াই থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে—আধুনিক ব্রিটেন।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন