← মূল পেজে ফিরে যান

চীন কেন বিপুল পরিমাণ সোনা কিনছে?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 09 Oct 2026, 02:48 PM | ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভর করে চলছে বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সেই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি যদি বিপুল পরিমাণ সোনা কিনতে থাকে, তাহলে এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? চীন ঠিক এমন এক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব বদলে দিতে পারে! একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্য, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভয় আর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা—সবকিছু বিবেচনায় রেখে চীন কেন সোনার দিকে ঝুঁকছে? বেইজিং কি শুধু নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে চাইছে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে? চীনের এই সোনা কেনার কৌশলের পেছনে আসল কারণ কী, আর এর প্রভাব ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা গভীর হতে পারে? চীনের সোনা কেনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিভিন্ন দেশের আর্থিক লেনদেনে ডলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চীনের মতো বড় অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদের একটি বড় অংশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আটকে যাওয়ার ঘটনা চীনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংঘাত তৈরি হলে বিদেশে রাখা চীনের কিছু সম্পদও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সোনা কোনো নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা নয়। তাই কোনো দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সোনা দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ সংরক্ষণের একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হলো, নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা। চীনের রিজার্ভে দীর্ঘদিন ধরে ডলার ও মার্কিন সরকারি বন্ড গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু ডলারের মূল্য কমে গেলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে এসব সম্পদের মূল্য প্রভাবিত হতে পারে। তাই সোনার মজুত বাড়িয়ে বিভিন্ন সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে চীন। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটি সব ডলার বিক্রি করে সোনা কিনছে। চীনের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। দেশটি চায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার আরও বাড়ুক এবং বিভিন্ন দেশ লেনদেনের ক্ষেত্রে এই মুদ্রার ওপর আস্থা রাখুক। সোনার শক্তিশালী মজুত চীনের আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতি আস্থা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু সোনা জমালেই ইউয়ান ডলারের বিকল্প হয়ে উঠবে না। এর জন্য আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা, মুদ্রার সহজ বিনিময়যোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাও প্রয়োজন। এদিকে, চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সোনার চাহিদা বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখছে। দেশটির আবাসন খাতে দীর্ঘদিনের চাপ এবং শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক মানুষ বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। তাঁদের কাছে সোনা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ছোট আকারের সোনার বার ও সোনার দানা কেনার প্রবণতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে সোনার দামও ওঠানামা করে, তাই এটিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ বলা যায় না। সব মিলিয়ে, চীনের সোনা কেনার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা। ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকট কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে সোনার মজুত চীনকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চীনের এই কৌশল কি সত্যিই বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য কমাতে পারবে? এর উত্তর নির্ভর করবে শুধু সোনার মজুতের ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতার ওপরও। একটি বিষয় পরিষ্কার—বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ অবস্থান শক্তিশালী করতে চীন এখন শুধু বর্তমানের হিসাব করছে না, বরং সম্ভাব্য সংকটের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে সোনা হয়ে উঠছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন