← মূল পেজে ফিরে যান

মধ্যপ্রাচ্যে এত তেল জমা হলো কীভাবে?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 12 Oct 2026, 10:44 AM | ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
News Image
ছবি ক্রেডিট: গুগল
ভাবুন তো, চারদিকে ধু ধু মরুভূমি, অথচ সেই বালুর নিচেই লুকিয়ে আছে এমন এক সম্পদ, যার ওপর নির্ভর করছে বিশ্বের অর্থনীতি, পরিবহনব্যবস্থা ও শিল্পকারখানার বিশাল একটি অংশ। এই সম্পদ হলো খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের মতো মরুভূমিপ্রধান অঞ্চলে এত বিপুল পরিমাণ তেল জমা হলো কীভাবে? পৃথিবীর অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় এখানেই কেন রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলভাণ্ডার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর ইতিহাসে। বর্তমানে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বিপুল তেলসম্পদের জন্য পরিচিত। বিশ্বের প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুদের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। তবে এই সম্পদ তৈরি হওয়ার পেছনে শুধু মরুভূমি বা আবহাওয়ার কোনো ভূমিকা নেই। বরং এর মূল কারণ হলো এ অঞ্চলের বিশেষ ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ, যা তেল তৈরি হওয়া এবং ভূগর্ভে দীর্ঘদিন জমা থাকার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলজুড়ে ছিল অগভীর সমুদ্র। এসব সমুদ্রে বাস করত অসংখ্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক অণুজীব, শৈবাল ও অন্যান্য প্রাণী। এদের মৃত্যুর পর দেহাবশেষ সমুদ্রের তলদেশে জমা হতো। অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকায় জৈব পদার্থের একটি অংশ পুরোপুরি পচে নষ্ট না হয়ে কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়ে যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর জমতে থাকে পলির পর পলি, আর জৈব পদার্থগুলো চলে যায় ভূগর্ভের আরও গভীরে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ রাসায়নিক পরিবর্তন। মাটির গভীরে তাপমাত্রা ও চাপ বাড়ার ফলে উপযুক্ত পরিবেশে এসব জৈব পদার্থ কোটি কোটি বছর ধরে পরিবর্তিত হয়ে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত হয়। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের তেলভাণ্ডার একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং প্রকৃতির ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। তবে তেল তৈরি হলেই বিশাল তেলভাণ্ডার গড়ে ওঠে না। সেই তেলকে ভূগর্ভে আটকে রাখার ব্যবস্থাও থাকতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক এলাকায় ছিদ্রযুক্ত চুনাপাথর ও বেলেপাথরের স্তর রয়েছে। এসব শিলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গায় তেল ও গ্যাস জমা হতে পারে। ভূতত্ত্বে এগুলোকে বলা হয় রিজার্ভার রক। আবার এসব স্তরের ওপরে থাকা অভেদ্য শিলা কিংবা লবণের স্তর তেল ও গ্যাসকে সহজে ভূপৃষ্ঠে উঠে যেতে বাধা দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি জমা থাকতে পারে। এ অঞ্চলের তেলসম্পদ গড়ে ওঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া। আরবীয় প্লেটের উত্তরমুখী গতি এবং ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ভূগর্ভে বিভিন্ন ভাঁজ ও গঠন তৈরি হয়েছে। এসব গঠনের কিছু প্রাকৃতিক ফাঁদের মতো কাজ করে তেল ও গ্যাসকে নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখে। পারস্য উপসাগরের আশপাশে এমন অনেক বড় তেলক্ষেত্র রয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এখানকার অনেক তেলক্ষেত্র আকারে বিশাল এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে উত্তোলন করা সম্ভব। তবে সব তেলক্ষেত্র সমান সহজে উত্তোলনযোগ্য নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, পাইপলাইন, বন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানির সুবিধাও এ অঞ্চলের জ্বালানি শিল্পকে শক্তিশালী করেছে। সব মিলিয়ে, প্রাচীন সমুদ্র, সামুদ্রিক জীবের দেহাবশেষ, ভূগর্ভের তাপ ও চাপ এবং উপযুক্ত শিলাস্তরের সম্মিলিত প্রভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে এত বিপুল তেলসম্পদ জমা হয়েছে। আজ যে অঞ্চলকে আমরা মরুভূমি হিসেবে দেখি, তার মাটির নিচেই লুকিয়ে রয়েছে কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক ইতিহাস। আর এই তেল ও গ্যাসই মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন