← মূল পেজে ফিরে যান
বুর্জ খলিফা কেন এত বিখ্যাত?
রিপোর্টার: সালমা জাহান |
প্রকাশিত: 09 Oct 2026, 10:10 AM |
ক্যাটাগরি: প্রযুক্তি ও জীবনযাপন
ছবি ক্রেডিট: এআই
একবার কল্পনা করুন, এমন একটি ভবন যার চূড়ায় তাকালে মনে হবে আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে! নিচে দাঁড়িয়ে মানুষকে সেখানে ছোট বিন্দুর মতো দেখায়, আর এর ওপরের তলাগুলো থেকে দেখা যায় পুরো শহরের বিস্তৃত দৃশ্য। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এমন স্থাপত্য বাস্তবেই তৈরি করেছে মানুষ। নাম তার বুর্জ খলিফা। কিন্তু মরুভূমির বুকে কীভাবে নির্মিত হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এই ভবন? আর এত উচ্চতায় দাঁড়িয়েও এটি কীভাবে প্রবল বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে স্থির থাকে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত বুর্জ খলিফা শুধু একটি আকাশচুম্বী ভবন নয়, এটি আধুনিক প্রকৌশল ও স্থাপত্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে ভবনটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে। এর স্থাপত্যগত উচ্চতা ৮২৮ মিটার, আর চূড়ার শীর্ষ পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় ৮২৯.৮ মিটার বা ২ হাজার ৭২২ ফুট। ১৬৩ তলাবিশিষ্ট এই ভবন দুবাইয়ের আকাশরেখাকে দিয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয়।
তবে এত উঁচু ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ ছিল না। ২০০৪ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। বালুময় মাটির ওপর এমন বিশাল স্থাপনা দাঁড় করাতে প্রয়োজন হয়েছিল বিশেষ ভিত্তি, শক্তিশালী কাঠামো এবং উন্নত নির্মাণপ্রযুক্তির। ভবনটির ভিত্তি তৈরি করা হয় পুরু রিইনফোর্সড কংক্রিটের স্তর ও মাটির গভীরে বসানো শক্তিশালী কংক্রিটের পাইলের সাহায্যে। ফলে ওপরের বিপুল ওজন নিরাপদে মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
এর নকশার পেছনেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক চিন্তা। যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর, ওয়িংস অ্যান্ড মেরিলের স্থপতি অ্যাড্রিয়ান স্মিথের নকশায় তৈরি ভবনটির ভূমির পরিকল্পনা ইংরেজি ‘Y’ অক্ষরের মতো। এর অনুপ্রেরণা এসেছে মরুভূমির হাইমেনোক্যালিস ফুলের আকৃতি এবং ইসলামি স্থাপত্যের জ্যামিতিক নকশা থেকে। তিনটি ডানার মতো অংশ কেন্দ্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করে। আর ওপরের দিকে ধাপে ধাপে সরু হয়ে ওঠা নকশা বাতাসের চাপ সামলাতেও সাহায্য করে। অর্থাৎ, সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও রাখা হয়েছে নকশার কেন্দ্রে।
বুর্জ খলিফার আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর বহুমুখী ব্যবহার। এটি কেবল পর্যটকদের দেখার জায়গা নয়। এর ভেতরে রয়েছে বিলাসবহুল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট, করপোরেট অফিস, রেস্তোরাঁ এবং বিখ্যাত আরমানি হোটেল। হোটেলটির অভ্যন্তরীণ নকশায় ইতালীয় ফ্যাশন ডিজাইনার জর্জিও আরমানির নকশাশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে একই ভবনের মধ্যে বসবাস, ব্যবসা ও বিলাসবহুল আতিথেয়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভবনটির ওপর থেকে দুবাই দেখার অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। ১২৪ ও ১২৫ তলায় রয়েছে ‘অ্যাট দ্য টপ’ পর্যবেক্ষণ এলাকা। আরও ওপরে, ১৪৮ তলায় রয়েছে প্রায় ৫৫৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পর্যবেক্ষণ ডেক। সেখান থেকে শহরের বিস্তৃত দৃশ্য, মরুভূমি এবং পারস্য উপসাগরের দিকের দৃশ্য দেখা যায়।
বুর্জ খলিফার নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। নির্মাণের আগে ভবনটি ‘বুর্জ দুবাই’ নামে পরিচিত ছিল। উদ্বোধনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সম্মানে এর নাম রাখা হয় বুর্জ খলিফা।
সব মিলিয়ে, বুর্জ খলিফা প্রমাণ করেছে যে মানুষের পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল একসঙ্গে কাজ করলে স্থাপত্যের সীমা অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে এর গুরুত্ব শুধু উচ্চতার রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি, পর্যটন এবং আধুনিক নগর উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। আর সেই কারণেই আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন আজও সারা বিশ্বের মানুষের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: