← মূল পেজে ফিরে যান

এত সম্পদ থাকার পরও আফ্রিকা কেন গরিব?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 07 Oct 2026, 07:50 PM | ক্যাটাগরি: অর্থনীতি ও ব্যবসা
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, পৃথিবীর অন্যতম সম্পদশালী একটি মহাদেশ—যার মাটির নিচে রয়েছে সোনা, হীরা, তেল, গ্যাস, তামা, কোবাল্ট এমনকি ইউরেনিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ। অথচ এই মহাদেশের বহু মানুষ এখনও দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সংকটে ভুগছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও আফ্রিকার অনেক দেশ কেন অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে? এর উত্তর কোনো একটি কারণে লুকিয়ে নেই। বরং ইতিহাস, রাজনীতি, দুর্নীতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই জটিল পরিস্থিতি। প্রথমেই আসে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার। একটি দেশে প্রচুর তেল বা খনিজ থাকলেই যে সেই দেশের মানুষ ধনী হবে, এমনটা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পদ থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ রাষ্ট্রের উন্নয়নের বদলে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অর্থনীতিতে এই সমস্যাকে বলা হয় ‘সম্পদের অভিশাপ’। সম্পদ যত বেশি, তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা ও সংঘাতও কখনও কখনও তত বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান। সরকারি অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সম্পদ থেকে রাষ্ট্র কত আয় করছে এবং সেই অর্থ জনগণের জন্য কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। শিক্ষা, হাসপাতাল, নিরাপদ পানি কিংবা যোগাযোগব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত তখন প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়। আবার আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে। যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলে শুধু মানুষের জীবনই বিপর্যস্ত হয় না, কৃষি, ব্যবসা, শিল্প, পরিবহন ও শিক্ষা—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। রাস্তা, সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলে একটি দেশের অর্থনীতি আবার দাঁড় করাতেই বহু বছর লেগে যেতে পারে। আরেকটি বড় বাধা হলো অবকাঠামোর ঘাটতি। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ, সড়ক, রেলপথ ও বন্দরব্যবস্থা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল। ফলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল হয় এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। আফ্রিকার অনেক দেশ তাই নিজেদের কাঁচামাল রপ্তানি করলেও সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি বেশি দামের পণ্য আবার বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর পেছনে ইতিহাসের প্রভাবও কম নয়। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের সময় আফ্রিকার বহু অঞ্চলের সম্পদ বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একই সময়ে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে। স্বাধীনতার পর অনেক দেশকে তাই দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সীমিত শিল্পভিত্তি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মতো কঠিন বাস্তবতা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়। তবে আফ্রিকাকে শুধু দারিদ্র্যের মহাদেশ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এখানে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশাল কৃষি সম্ভাবনা এবং তরুণ জনগোষ্ঠী। সঠিক শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং নিজস্ব শিল্প গড়ে তুলতে পারলে এই সম্পদই আফ্রিকার অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি হতে পারে। তাই আফ্রিকার মূল সমস্যা সম্পদের অভাব নয়—বরং সেই সম্পদ থেকে তৈরি হওয়া সুযোগগুলো কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন