← মূল পেজে ফিরে যান

বৈকাল হ্রদ এত গভীর কেন?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 05 Oct 2026, 01:36 PM | ক্যাটাগরি: আবহাওয়া ও পরিবেশ
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, পৃথিবীর এমন একটি হ্রদ, যার গভীরে নামতে নামতে প্রায় দেড় কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে, তবুও শেষ পর্যন্ত তলদেশে পৌঁছানো যাবে না! রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় অবস্থিত বৈকাল হ্রদের সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১ হাজার ৬৪২ মিটার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি হ্রদ এত গভীর হলো কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ভূত্বকের দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্যে। বৈকাল হ্রদ সাধারণ কোনো জলাশয় নয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন রিফট অঞ্চলের ওপর তৈরি হয়েছে। রিফট হলো এমন একটি ভূতাত্ত্বিক এলাকা, যেখানে পৃথিবীর ভূত্বকের বিশাল অংশ ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। বৈকাল অঞ্চলেও কোটি কোটি বছর ধরে এমন টান তৈরি হয়েছে। ফলে ভূত্বকে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই ফাটলের মাঝের ভূমি ধীরে ধীরে নিচের দিকে বসে গিয়ে একটি বিশাল অববাহিকা তৈরি করেছে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী, বৃষ্টি ও আশপাশের বিভিন্ন উৎসের পানি সেই গভীর অববাহিকায় জমতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় আজকের বৈকাল হ্রদ। অর্থাৎ, এর গভীরতা শুধু পানির পরিমাণের কারণে নয়; বরং হ্রদের নিচে থাকা বিশাল ভূতাত্ত্বিক গঠনই এর আসল কারণ। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা এই প্রক্রিয়াই বৈকালকে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর হ্রদে পরিণত করেছে। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। বৈকাল যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে এখনো ভূতাত্ত্বিক নড়াচড়া এবং ভূমিকম্পের ঘটনা দেখা যায়। এর মানে হলো, যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া একসময় এই বিশাল অববাহিকা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল, তার কিছু কার্যক্রম এখনও সক্রিয়। তাই বৈকালকে শুধু একটি পুরোনো হ্রদ নয়, বরং পৃথিবীর ভূত্বকের পরিবর্তন বোঝার একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়। গভীরতার পাশাপাশি বৈকাল হ্রদের আয়তনও বিস্ময়কর। এটি প্রায় ৬৩৬ কিলোমিটার লম্বা এবং পৃথিবীর উন্মুক্ত তরল মিষ্টি পানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি ধারণ করে। পানির স্বচ্ছতার জন্যও হ্রদটি বিখ্যাত। শীতকালে এর ওপর বরফ জমলে কোথাও কোথাও বরফ এতটাই স্বচ্ছ হয়ে ওঠে যে তার নিচের অংশ দেখা যায়। নীলচে বরফের ভেতর আটকে থাকা বুদবুদ ও লম্বা ফাটলের দৃশ্য তখন হ্রদটিকে আরও অন্যরকম করে তোলে। আর এই গভীর ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশে গড়ে উঠেছে অনন্য এক জীবজগৎ। বৈকালে হাজার হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, যাদের অনেকগুলো পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণীদের একটি হলো বৈকাল সিল বা নের্পা। এটি পৃথিবীর একমাত্র সম্পূর্ণ মিঠাপানির সিল প্রজাতি। সমুদ্র থেকে এত দূরের একটি হ্রদে এই প্রাণীর পূর্বপুরুষরা কীভাবে পৌঁছেছিল, সেটিও বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয়। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈকাল হ্রদের বয়স প্রায় আড়াই কোটি বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে ভূত্বকের পরিবর্তন, অববাহিকা তৈরি, পানির সঞ্চয় এবং জীবনের বিবর্তন—সবকিছু মিলেই আজকের বৈকাল গড়ে উঠেছে। তাই বৈকাল শুধু পৃথিবীর গভীরতম হ্রদ নয়; এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্য বোঝার জন্যও এক অসাধারণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন