← মূল পেজে ফিরে যান
ফোরাত নদী কি সত্যিই শুকিয়ে যাচ্ছে?
রিপোর্টার: সালমা জাহান |
প্রকাশিত: 09 Oct 2026, 03:07 PM |
ক্যাটাগরি: আবহাওয়া ও পরিবেশ
ছবি ক্রেডিট: এআই
একটা নদী, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস। অথচ আজ সেই নদীর পানিই ক্রমেই কমে যাচ্ছে! কোথাও জেগে উঠছে নদীর তলদেশ, কোথাও দেখা দিচ্ছে পানির তীব্র সংকট। কিন্তু এই নদীকে ঘিরে রয়েছে এমন একটি ধর্মীয় বর্ণনা, যা কোটি মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগাচ্ছে। ফোরাত নদী কি সত্যিই শুকিয়ে যাচ্ছে? কেন কমছে এর পানি, আর এর পরিণতি কী হতে পারে?
ফোরাত, যা ইউফ্রেটিস নদী নামেও পরিচিত, পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। তুরস্কের পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি সিরিয়া পেরিয়ে ইরাকে প্রবেশ করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই নদীর পানি কৃষিকাজ, মানুষের বসতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান অবলম্বন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার বিকাশেও ফোরাত ও টাইগ্রিস নদীর অবদান ছিল অসামান্য। কিন্তু বর্তমানে নদীটির পানির প্রবাহ কমে যাওয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়ম নদী অববাহিকায় পানির ঘাটতি বাড়াচ্ছে। তাপমাত্রা বেশি হলে মাটি ও জলাধার থেকে পানির বাষ্পীভবনও বেড়ে যায়। ফলে নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি রয়েছে মানুষের তৈরি বিভিন্ন অবকাঠামো। তুরস্ক ও সিরিয়ায় ফোরাত নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ এবং সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করা হয়। উজানে পানির ব্যবহার এবং জলাধারে পানি ধরে রাখার প্রভাব ভাটির দেশ ইরাকেও পড়তে পারে। অন্যদিকে কৃষিকাজ ও জনসংখ্যার চাহিদা বাড়ায় পানির ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।
নদীর পানি কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। সিরিয়া ও ইরাকের বহু অঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য নদীর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়, ফসলের উৎপাদন কমতে পারে এবং খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। পাশাপাশি নদীর ওপর নির্ভরশীল মৎস্যসম্পদ, পশুপালন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বহু মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ফোরাত নদী নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা মুসলিমদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইসলামের সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের আগে ফোরাত নদী তার তলদেশ থেকে স্বর্ণের পাহাড় প্রকাশ করবে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সংঘাতের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে নদীর পানি কমে যাওয়ার খবর সামনে এলে অনেকেই হাদিসের বর্ণনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সম্পর্ক খোঁজেন। তবে নদীর পানি কমে যাওয়াকে সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না।
এদিকে, ২০৪০ সালের মধ্যে ফোরাত নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতে পারে—এমন দাবিও বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট একটি বছরকে নদীটির সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সময় হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে জলবায়ুর পরিস্থিতি, পানির ব্যবহার, বাঁধ পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার ওপর।
ফোরাত নদীর সংকট তাই শুধু একটি নদীর পানি কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি পুরো অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। হাজার বছরের ইতিহাস বহন করা এই নদীকে রক্ষা করতে এখনই পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জরুরি। কারণ, নদীর পানি কমে গেলে তার প্রভাব শুধু নদীর তীরে থেমে থাকে না—ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রতিটি স্তরে।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: