← মূল পেজে ফিরে যান

উইলহেলম গুস্টলফ কীভাবে ডুবে গেল?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 04 Oct 2026, 12:35 PM | ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন, সমুদ্রের বুকে একটি জাহাজে উঠেছেন হাজার হাজার মানুষ। বাইরে তখন প্রচণ্ড শীত, চারপাশ অন্ধকার, আর নিচে বরফশীতল বাল্টিক সাগর। হঠাৎ একের পর এক বিস্ফোরণ! কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশাল জাহাজটি কাত হয়ে ডুবতে শুরু করল। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—জাহাজটিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল তার স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ। ১৯৪৫ সালের সেই রাতে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যার ভয়াবহতা আজও ইতিহাসের পাতায় প্রশ্ন জাগায়—কীভাবে একটি জাহাজ হাজার হাজার মানুষের জন্য পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে? জাহাজটির নাম ছিল এমভি উইলহেলম গুস্টলফ। ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি জার্মানির ‘ক্রাফট ডুর্খ ফ্রয়ডে’ কর্মসূচির অধীনে এটি তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জার্মান শ্রমিকদের জন্য বিনোদন ও সমুদ্রভ্রমণের ব্যবস্থা করা। প্রায় ২০৮ মিটার দীর্ঘ জাহাজটি ১৯৩৭ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করে এবং সে সময় বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজটির ভূমিকা বদলে যায়। এটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব প্রুশিয়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। ফলে যুদ্ধের এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষ ও সামরিক সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য শুরু হয় বিশাল সমুদ্রপথের উদ্ধার অভিযান, যা ‘অপারেশন হ্যানিবাল’ নামে পরিচিত। ৩০ জানুয়ারি রাতে উইলহেলম গুস্টলফ বাল্টিক সাগর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। এতে নারী, শিশু, বেসামরিক মানুষ ও সামরিক সদস্যসহ ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ ছিল। অথচ জাহাজটির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ছিল এর তুলনায় অনেক কম। রাতের অন্ধকারে সোভিয়েত সাবমেরিন এস-১৩ জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করে। এরপর পরপর তিনটি টর্পেডো ছোড়া হয়। তিনটিই জাহাজে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের পর দ্রুত পানি ঢুকতে শুরু করে এবং মুহূর্তেই যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই তখন বাঁচার জন্য বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বিপদ ছিল আরও ভয়াবহ। বাইরে ছিল তীব্র শীত, আর সমুদ্রের পানি ছিল প্রায় বরফশীতল। এত বিপুল মানুষের তুলনায় পর্যাপ্ত লাইফবোটও ছিল না। ফলে অনেকেই জাহাজ থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাননি। যারা পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, তাদের জন্যও বেঁচে থাকা ছিল অত্যন্ত কঠিন। অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল জাহাজটি বাল্টিক সাগরের গভীরে তলিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, এই ঘটনায় প্রায় ৯ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু ছিল। প্রাণহানির দিক থেকে এই সংখ্যা টাইটানিকের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। তবে যুদ্ধকালীন বিশৃঙ্খলার কারণে নিহতের সঠিক সংখ্যা আজও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আজ উইলহেলম গুস্টলফের ধ্বংসাবশেষ বাল্টিক সাগরের তলদেশে পড়ে আছে এবং স্থানটি যুদ্ধসমাধি হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ থেকে যুদ্ধকালীন পরিবহন জাহাজ—শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জাহাজডুবির ঘটনাগুলোর একটিতে।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন