← মূল পেজে ফিরে যান

মহাকাশ থেকে কেন আসছে রেডিও সংকেত?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 01 Oct 2026, 01:28 PM | ক্যাটাগরি: প্রযুক্তি ও জীবনযাপন
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটা গ্রহ থেকে রেডিও তরঙ্গ আসছে, আর সেই সংকেত পৃথিবীতে বসে বিজ্ঞানীরা ধরতে পারছেন! শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো লাগলেও, ঘটনাটি বাস্তব। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই সংকেত কোনো এলিয়েনের পাঠানো বার্তা নয়। গ্রহটির নাম বেটা পিক্টোরিস বি। এটি একটি বিশাল গ্যাস জায়ান্ট, যা আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতির তুলনায় অনেক বেশি ভরসম্পন্ন। গ্রহটি বেটা পিক্টোরিস নামের একটি তরুণ নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরছে। পৃথিবী থেকে এই পুরো নক্ষত্রব্যবস্থার দূরত্ব প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ আমরা আজ যে সংকেত শনাক্ত করছি, সেটি আসলে বহু বছর আগে ওই গ্রহের কাছ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার MeerKAT রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে দিয়ে বিজ্ঞানীরা এই রেডিও নির্গমন শনাক্ত করেন। বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, সংকেতগুলো শুধু একবার আসেনি। গবেষণায় দ্রুত পুনরাবৃত্তি হওয়া রেডিও বিস্ফোরণ এবং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী রেডিও নির্গমন—দুই ধরনের সিগন্যালই পাওয়া গেছে। এগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি ছিল প্রায় ০.৮৫ থেকে ৩.৫ গিগাহার্টজ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কীভাবে বুঝলেন যে সংকেতটি সত্যিই গ্রহ থেকেই আসছে? কারণ এত দূর থেকে কোনো নক্ষত্রব্যবস্থার রেডিও সিগন্যাল ধরা পড়লে প্রথম প্রশ্নই হয়—এটা নক্ষত্র থেকে আসছে, নাকি গ্রহ থেকে? গবেষকরা রেডিও ছবির অবস্থানকে দূরের কোয়াসারসহ নির্ভুল মহাজাগতিক অবস্থান-চিহ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এরপর দেখা যায়, রেডিও নির্গমনের অবস্থান বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্রের নয়, বরং বেটা পিক্টোরিস বি-এর অবস্থানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এ কারণেই এটিকে কোনো এক্সোপ্ল্যানেট থেকে সরাসরি শনাক্ত হওয়া রেডিও নির্গমনের প্রথম নিশ্চিত উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—এই রেডিও তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে কীভাবে? গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর পেছনে রয়েছে অরোরা বা মেরুজ্যোতির সঙ্গে সম্পর্কিত চৌম্বকীয় প্রক্রিয়া। পৃথিবীতে সূর্য থেকে আসা চার্জযুক্ত কণা যখন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন মেরু অঞ্চলে অরোরা দেখা যায়। বেটা পিক্টোরিস বি-এর ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ধরনের প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গ তৈরি হতে পারে। আর এখানেই আসে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। রেডিও নির্গমনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা অনুমান করেছেন, যে অঞ্চলে এই তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে সেখানে গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি অন্তত প্রায় ১,২৫০ গস। এটি এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পর্কে সরাসরি শক্তিমানের প্রথম পরিমাপ হিসেবে গবেষণাটিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এই তথ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ একটি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র তার বায়ুমণ্ডলকে নক্ষত্রের চার্জযুক্ত কণা বা স্টারলারের প্রভাব থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দূরের গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে পারলে সেই গ্রহের পরিবেশ কেমন হতে পারে, সেটাও বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়। তবে আবারও মনে রাখতে হবে—এটা কোনো এলিয়েন বার্তা নয়। রেডিও সংকেত প্রাকৃতিকভাবেও তৈরি হতে পারে। বরং এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব হলো, প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বকীয় পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাওয়ার পথ খুলে গেছে। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে এমন সংকেত পর্যবেক্ষণ করা গেলে, সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলো কীভাবে তৈরি হয়, তাদের চৌম্বক ক্ষেত্র কীভাবে কাজ করে এবং তাদের নক্ষত্রের সঙ্গে কী ধরনের মিথস্ক্রিয়া হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবেন।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন