← মূল পেজে ফিরে যান
ভারতে কেন গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতন হয় না?
রিপোর্টার: আরাফাত শিমান্ত |
প্রকাশিত: 02 Sep 2026, 10:21 PM |
ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
ভাবুন, একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন লাখ লাখ মানুষ ঘিরে ফেলেছে। রাজধানীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সরকার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, আর সেনাপ্রধান জরুরি বৈঠক ডাকছেন। এমন দৃশ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা গেলেও ভারতের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এটি ঘটেনি।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বড় গণআন্দোলন রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কখনো গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। অথচ ভারতে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, কৃষক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং রাজনৈতিক বিরোধ—সবই রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত সংকটের পরও ভারত কেন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল?
এর প্রথম কারণ ভারতের ফেডারেল কাঠামো। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী রয়েছে। ফলে দিল্লির বিরুদ্ধে আন্দোলন হলেই পুরো দেশের মানুষ একই সঙ্গে রাস্তায় নামে না। কোনো রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়, কোথাও কংগ্রেস, আবার কোথাও আঞ্চলিক দল। তাই মানুষের ক্ষোভও অনেক সময় কেন্দ্রের বদলে রাজ্য সরকারের দিকে চলে যায়।
দ্বিতীয় কারণ ভারতের বিশাল নিরাপত্তা কাঠামো। রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে CRPF, BSF, CISF, ITBP, SSB, Assam Rifles এবং NSG-এর মতো বিভিন্ন বাহিনী। ফলে কোনো একটি বাহিনী পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হলে অন্য বাহিনীকে কাজে লাগানো যায়। এতে সরকারকে সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয় না।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ—ভারতে নিয়মিত নির্বাচন হয়। ১৯৫২ সাল থেকে ভারতীয়রা ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করে আসছে। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী, ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধী এবং ২০০৪ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনী পরাজয়ের মুখে পড়ে। অর্থাৎ জনগণ জানে, সরকার পছন্দ না হলে পাঁচ বছর পর তাকে ভোটের মাধ্যমে সরানো সম্ভব।
এর সঙ্গে রয়েছে ভারতের অসাধারণ বৈচিত্র্য। দেশটিতে ২২টি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ভাষা, অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষা, বিভিন্ন ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচয় রয়েছে। কাশ্মীরের ইস্যু যেমন কেরালার মানুষের কাছে প্রধান সমস্যা নয়, তেমনি তামিলনাড়ুর ভাষার রাজনীতি পাঞ্জাবের মানুষের কাছে একই গুরুত্ব বহন করে না।
ফলে ভারতে আন্দোলন হয়, কিন্তু সব আন্দোলন একই দাবিতে একত্রিত হয় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছাত্ররাজনীতি। ভারতের ABVP, NSUI, SFIসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক আদর্শ আলাদা। ফলে একটি ছাত্র আন্দোলনকে সারা দেশের অভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করা কঠিন।
এখানে অজিত দোভালের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ মোকাবিলায় কঠোর নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে ভারতের স্থিতিশীলতার কারণ শুধু একজন ব্যক্তি নন; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে আসল কথাটি হলো—ভারতে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের অনেকগুলো বৈধ পথ রয়েছে। ভোট, আদালত, সংসদ, মিডিয়া, বিরোধী দল কিংবা রাজপথ—সবকিছু মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তাই এখন পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলছে, সরকার পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র সেখানে গণঅভ্যুত্থান নয়—ব্যালট বাক্স।
তবে ভবিষ্যৎ কখনো নিশ্চিত নয়। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা যতদিন শক্ত থাকবে, ততদিন ভারতে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার পতনের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
জাতীয় জার্নাল—তথ্য, ইতিহাস ও বিশ্লেষণের আলোকে বিশ্বকে দেখার একটি প্রচেষ্টা।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: