← মূল পেজে ফিরে যান
পুতিন বনাম হোয়াইট হাউস: ২৪ বছরের অসম যুদ্ধের মহাকাব্য
রিপোর্টার: আরাফাত শিমান্ত |
প্রকাশিত: 31 Aug 2026, 08:48 PM |
ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
১৯৯৯ সাল। অসুস্থ বরিস ইয়েলৎসিনের উত্তরসূরি হিসেবে ক্রেমলিনের ক্ষমতা নেন ভ্লাদিমির পুতিন। তখন পশ্চিমা বিশ্বে তাকে নিয়ে সংশয় থাকলেও, সময়ের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। ১৯৯৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমেরিকা ছয় মেয়াদে পাঁচজন প্রেসিডেন্ট পেলেও—ক্লিন্টন, বুশ, ওবামা, বাইডেন ও ট্রাম্প—তাদের কেউই পুতিনকে দমাতে পারেননি। বরং সাবেক এই কেজিবি এজেন্ট তার সুনিপুণ রাজনৈতিক চালে হোয়াইট হাউসের অধিপতিদের বারবার কোণঠাসা করেছেন।
২০০০ সালে বিল ক্লিন্টনের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমেই পুতিনের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। ক্ষমতায় এসেই পুতিন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ নেন—রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অলিগার্কদের দমন এবং চেচনিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কঠোর হাতে দমন। ক্লিন্টন প্রশাসন মানবাধিকারের কথা বললেও, পুতিন নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে রাশিয়াকে সুসংহত করেন। এরপর জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ২০০৮ সালে জর্জিয়া সংকট এবং ন্যাটো সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে পুতিনের কঠোর অবস্থান বুশ প্রশাসনকে বিপাকে ফেলে।
বারাক ওবামার সময় এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র রূপ নেয়। লিবিয়া ও সিরিয়া সংঘাতে মার্কিন নীতিকে পাশ কাটিয়ে পুতিন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখেন। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে পুতিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ভূরাজনৈতিক সীমানা বদলে দেন, যা ওবামাকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে বাধ্য করলেও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে পারেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন রাজনীতিতে পুতিনের প্রভাব এক নতুন মাত্রা পায়। ২০১৮ সালের হেলসিংকি সম্মেলনে ট্রাম্পের সাথে তার গোপন বৈঠক এবং মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার কথিত হস্তক্ষেপ পশ্চিমা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে টানাপোড়েনের মাঝেই পুতিন রাশিয়ার সামরিক শক্তি ও হাইপারসোনিক অস্ত্রের বিস্তার বাড়াতে থাকেন।
সবশেষে জো বাইডেনের আমলে শুরু হয় চরম ইউক্রেন সংকট। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের নির্দেশে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে অভিযান শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্ব ও বাইডেন প্রশাসন কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিলেও, পুতিন তার কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখে রাশিয়াকে টিকিয়ে রাখেন।
জো বাইডেন প্রশাসনের পর ২০২৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হোয়াইট হাউসে ফিরে আসায় বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। ট্রাম্পের এই দ্বিতীয় মেয়াদে পুতিন ও আমেরিকার সম্পর্কের সমীকরণ যতই বদলাক না কেন, তা রুশ নেতার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। অতীতে ট্রাম্পের সাথে ক্রেমলিনের সুসম্পর্কের গুঞ্জন বা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নীতি—কোনো কিছুতেই পুতিনের অটল অবস্থান টলানো যায়নি। ইউক্রেন সংকট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ—সবক্ষেত্রেই পুতিন প্রমাণ করেছেন যে পশ্চিমাদের হাজারো চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি তার দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় টিকিয়ে রেখেছেন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে পুতিন প্রমাণ করেছেন যে, হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা যতই বিশাল হোক না কেন, ক্রেমলিনের লৌহমানবকে সহজে পরাজিত করা সম্ভব নয়। বিশ্বমঞ্চে পুতিনের এই অপরাজেয় নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ: