← মূল পেজে ফিরে যান

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প, বাড়ছে বেকারত্বের শঙ্কা

রিপোর্টার: রাকিব হাসান | প্রকাশিত: 27 Aug 2026, 12:26 PM | ক্যাটাগরি: অর্থনীতি ও ব্যবসা
News Image
দেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং ও গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় একদিকে বাড়ছে ব্যবসায়িক ক্ষতি, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা। ‎ ‎সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার খবর এসেছে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও আশুলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ‎ ‎নরসিংদীতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA)-এর সভাপতির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে প্রায় ৯০০টি টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এসব কারখানার কতগুলো শুধুমাত্র জ্বালানি সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা BTMA-ও দিতে পারেনি। ‎ ‎নরসিংদীর বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন বন্ধ বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কিছু কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। ‎ ‎আশুলিয়াতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। একটি ওয়েট প্রসেসিং কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য এসেছে। উৎপাদন কমে গেলে কারখানাগুলোর ওপর শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় বহনের চাপও বাড়ে। ‎ ‎গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। গাজীপুরে শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকার কারণে কিছু কারখানায় উৎপাদন ধীর হয়ে গেছে বা বন্ধ রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‎ ‎এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। ‎ ‎২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বাংলাদেশে প্রায় ২ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ পোশাক খাতের কর্মী। একই সময়ে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এসব চাকরি হারানোর পেছনে শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নয়; কমে যাওয়া রপ্তানি আদেশ, আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‎ ‎এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন—কারখানা যদি উৎপাদন কমায়, নতুন নিয়োগ বন্ধ করে অথবা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে একদিকে পুরোনো কর্মীরা চাকরি হারাবেন, অন্যদিকে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও সুযোগ কমে যাবে। ‎ ‎বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ILO বলছে, দেশে বেকারত্বের পাশাপাশি আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও কম বেতনের চাকরির সমস্যা রয়েছে; বিশেষ করে তরুণ ও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে। ‎ ‎অন্যদিকে BIDS-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, দেশের আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিটি চাকরির বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়ে ২৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মহামারির আগে ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগের তুলনায় চাকরিপ্রার্থীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। ‎ ‎তবে পুরো পরিস্থিতিকে একমাত্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। শিল্পখাতে অর্ডার কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তাও কারখানা বন্ধ ও কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বাড়াতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ‎ ‎এদিকে গার্মেন্টস খাতের সংগঠন BGMEA কিছু কারখানা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংবাদকে ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির দাবি, অনেক কারখানা সংকটের মধ্যেও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানা, সাময়িক উৎপাদন বন্ধ এবং কম সক্ষমতায় চলা কারখানা—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। ‎ ‎তারপরও বাস্তবতা হলো—যখন একটি শিল্পকারখানা দিনের পর দিন স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারে না, তখন শুধু মালিক নয়, শ্রমিকরাও সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েন। উৎপাদন বন্ধ মানে আয় কমে যাওয়া, ওভারটাইম কমে যাওয়া, নতুন নিয়োগ স্থগিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হওয়া। ‎ ‎বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল থাকলে এর প্রভাব শুধু কারখানার গেটের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে শ্রমিকের পরিবার, স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, বাসাবাড়ি ও পুরো অর্থনীতিতে। ‎ ‎এখন তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না। ‎ ‎কারণ শিল্প টিকলে কর্মসংস্থান টিকবে, আর কর্মসংস্থান টিকলেই বেকারত্বের চাপ কমানোর পথ তৈরি হবে। ‎ ‎গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ ও নতুন চাকরি সৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আর সেই পরিস্থিতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। ‎ ‎ ‎

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন