← মূল পেজে ফিরে যান

কেন বিখ্যাত অপেনহাইমার?

রিপোর্টার: সালমা জাহান | প্রকাশিত: 11 Oct 2026, 10:12 PM | ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক
News Image
ছবি ক্রেডিট: এআই
ভাবুন তো, একজন বিজ্ঞানী এমন এক অস্ত্র তৈরির নেতৃত্ব দিলেন, যা মুহূর্তের মধ্যে একটি শহরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ সেই অস্ত্র তৈরির পর একসময় তিনিই এর ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনই এক বিতর্কিত চরিত্র জে. রবার্ট অপেনহাইমার। যিনি একদিকে পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য বিখ্যাত, অন্যদিকে এই অস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিজ্ঞানীতে পরিণত করেছে। ১৯০৪ সালের ২২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন জুলিয়াস রবার্ট অপেনহাইমার। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছে পারমাণবিক বোমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছিল, নাৎসি জার্মানি হয়তো আগে পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলবে। এই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ১৯৪২ সালে শুরু হয় গোপন ম্যানহাটন প্রজেক্ট। এর লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা। এই বিশাল বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির অধীনে ১৯৪৩ সালে নিউ মেক্সিকোর লস আলামোস গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন অপেনহাইমার। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা একসঙ্গে কাজ করেন। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে পরিচালিত হয় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা, যার নাম ছিল ট্রিনিটি টেস্ট। বিস্ফোরণটি সফল হওয়ার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতা প্রবেশ করে এক নতুন পারমাণবিক যুগে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, সেই মুহূর্তে অপেনহাইমারের মনে পড়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্গীতার একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি—“আমি এখন মৃত্যু, বিশ্বের ধ্বংসকারী।” এই উক্তি পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। এর কয়েক সপ্তাহ পর, ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং আরও অনেকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ক্ষতির শিকার হন। জাপানের আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের সমাপ্তির পেছনে এসব হামলার ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে বোমা দুটির মানবিক বিপর্যয় বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। যুদ্ধের পর অপেনহাইমার পারমাণবিক অস্ত্রের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলেন। আরও শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা তৈরির বিষয়ে তাঁর আপত্তি মার্কিন সরকারের কিছু প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে। ১৯৫৪ সালে নিরাপত্তা শুনানির পর তাঁর নিরাপত্তা অনুমোদন বাতিল করা হয়। ফলে সরকারি গোপন গবেষণায় তাঁর প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান, রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। ১৯৬৩ সালে তাঁকে এনরিকো ফার্মি পুরস্কার দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৬৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ৬২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর জীবন নিয়ে ২০২৩ সালে পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান নির্মাণ করেন Oppenheimer চলচ্চিত্র, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সাতটি অস্কার জেতে। অপেনহাইমারের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—বিজ্ঞানের আবিষ্কার যখন মানুষের ধ্বংসের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, তখন সেই আবিষ্কারের দায় কার? বিজ্ঞানীর, রাষ্ট্রের, নাকি পুরো মানবজাতির? এই প্রশ্নের উত্তর আজও বিশ্বকে ভাবিয়ে তোলে।

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন