← মূল পেজে ফিরে যান

মার্কিন ডলার কীভাবে পুরো বিশ্বের চালিকাশক্তি হয়ে উঠল?

রিপোর্টার: জুনায়েদ আল হাবীব | প্রকাশিত: 12 Oct 2026, 01:00 AM | ক্যাটাগরি: ভাইরাল ও ট্রেন্ডিং
News Image
ছবি ক্রেডিট: ফাইল ফুটেজ
পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে, অন্য প্রান্তে বেড়ে যেতে পারে জ্বালানির দাম। বাংলাদেশের বাজারে বাড়তে পারে আমদানি করা পণ্যের মূল্য, আর বদলে যেতে পারে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের হিসাব। কিন্তু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার সঙ্গে মার্কিন ডলারের সম্পর্ক কী? কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুদ্রা পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে এতটা প্রভাব বিস্তার করল? এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক কৌশল এবং কয়েক দশকের ইতিহাস। ডলারের এই আধিপত্য বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ব্রিটিশ পাউন্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ব্রিটেনের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি তখন অনেক বেড়ে যায়। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ সোনার মজুতও ছিল দেশটির হাতে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে। এই পরিবর্তনকে স্থায়ী রূপ দেয় ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ৪৪টি মিত্রদেশের প্রতিনিধিরা যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করেন। ডলারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন ব্যবস্থা, যেখানে অন্যান্য দেশের মুদ্রার বিনিময়মূল্য ডলারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ডলার নির্দিষ্ট হারে সোনায় রূপান্তরযোগ্য ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থ লেনদেনে ডলারের গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু এই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭১ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে সোনায় রূপান্তরের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ, ডলারের সঙ্গে সোনার সরাসরি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, সোনার সমর্থন হারানোর পর ডলারের গুরুত্ব কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। কারণ, তত দিনে বিশ্ববাণিজ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে ডলারের অবস্থান অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এরপর ডলারের প্রভাব ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আন্তর্জাতিক তেলবাজার। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা গভীর হয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচায় ডলারের ব্যাপক ব্যবহার এর চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করে। বিভিন্ন দেশের তেল আমদানিকারকদের জ্বালানি কেনার জন্য ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় মুদ্রাটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে। তবে ডলারের আধিপত্যের পেছনে শুধু তেল নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডলারের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা সংকটের সময় অনেক বিনিয়োগকারী ডলার ও মার্কিন সরকারি বন্ডকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। পাশাপাশি ডলারে সহজে লেনদেন করা যায় এবং বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার ব্যাপক। ফলে ডলারের বিকল্প থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান এখনো এই মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল। তবে এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টাও চলছে। চীন নিজস্ব মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়াতে চাইছে, আর ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। এর জন্য দরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, গভীর আর্থিক বাজার, সহজে লেনদেনের সুযোগ এবং বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রভাব শুধু বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশেও তা অনুভূত হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। অন্যদিকে, প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের টাকায় রূপান্তরিত মূল্যও বদলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে, মার্কিন ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কয়েক দশকের ইতিহাস, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সমন্বয়ে ডলার আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এই অবস্থানও কি বদলাবে? ভবিষ্যতে কি কোনো মুদ্রা ডলারের জায়গা নিতে পারবে, নাকি আরও বহু বছর বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকবে মার্কিন ডলার?

সর্বশেষ প্রকাশিত খবর

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

জাতীয় জার্নাল ইউটিউব চ্যানেলের সর্বশেষ ভিডিওসমূহ:

আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন